চুরির টাকা ফেরত পাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক!

Loading...

আলোচিত রিজার্ভের চুরি যাওয়া টাকা ফেরত পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক্ষেত্রে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও দেশটির অ্যান্টি মানিলন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে দেশটির সুনাম ধরে রাখতে টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য ফিলিপিন্সের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনকে (আরসিবিসি) বাধ্য করা হচ্ছে। এ কারণেই টাকা ফেরত পাওয়ার উজ্জল সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের যেমন টাকা উদ্ধার করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, ঠিক তেমনিই ফিলিপাইনেরও টাকা ফেরত দেওয়ার আবশ্যিকতা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের যেমন ক্ষতি হয়েছে, তেমনি তাদেরও সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। স্বভাবতই চুরি যাওয়া টাকা তারা ফেরত দিয়ে সুনাম ধরে রাখার চেষ্টা করবে। তিনি বলেন, যেহেতেু রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনকে টাকা চুরির জন্য দায়ী করা হয়েছে। আবার সে দেশের গভর্নরও মনে করেন যে- সেখানকার অ্যান্টি মানিলন্ডারিং কাউন্সিলের দুর্বলতার কারণে এই ঘটনা ঘটেছে, এ কারণে তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সে দেশের অ্যান্টি মানিলন্ডারিং কাউন্সিল আমাদের সহায়তা করছে। পাশাপাশি আমরাও টাকা উদ্ধারে সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এর ফলে চুরি যাওয়া টাকা ফেরত পাওয়ার একটি উজ্জল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমের বোর্ড অব গভর্নেন্সের চেয়ারপারসন জেনেট ইয়েলেন, জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন, ফিলিপিন্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকো সেন্ট্রাল এনজি, ফিলিপিন্সের গভর্নর আমানদো এম তেতাংকো জুনিয়র এবং দেশটির অ্যান্টি মানিলন্ডারিং কাউন্সিলের প্রধান জুলিয়া সি বেকি-আবাদকে চিঠি দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও অ্যাটর্নি জেনারেলকেও চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুধু তাই নয়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সব নির্বাহী পরিচালক ও মহাব্যবস্থাপকদেরও চিঠি দিয়েছেন গভর্নর। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নথি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য এরইমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আজমালুল হক কিউসিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (এফআইইউ) থেকে এগমন্ট গ্রুপের কাছেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওই চিঠিতে ঘটনার পুরো বিবরণ দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে চুরি যাওয়া টাকা ফিরিয়ে আনতে তাদের আইনি সহায়তা চাওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানিলন্ডারিংয়ের (এপিজি) কাছেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। এতেও চুরি হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সহযোগিতা চেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ প্রসঙ্গে শুভঙ্কর সাহা বলেন, এমওইউ অনুযায়ী ফিলিপাইন আমাদের টাকা ফেরত দিতে বাধ্য। এ কারণে সময় লাগলেও আমরা টাকা ফেরত পাবো আশা করা যায়। কারণ, ফিলিপাইনে এটা রটে গেছে যে- সেখানে মানিলন্ডারিং করে বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সেখানকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সে দেশের অ্যান্টি মানিলন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) এটাকে জালিয়াতি বলছেন।

প্রসঙ্গত, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রিজার্ভ চুরির এই ঘটনাটি ঘটে ৫ ফেব্রুয়ারি। তবে বাংলাদেশের মানুষ জানতে পারে প্রায় এক মাস পর। এরপর ফিলিপিন্সের তদন্তে বেরিয়ে আসতে থাকে নতুন নতুন তথ্য। ফিলিপাইনের দৈনিক পত্রিকা ইনকোয়ারার এর প্রতিবেদন অনুযায়ী- চুরি হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজার্ভ ব্যাংকিং করপোরেশনের জুপিটার শাখায় ছিল ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সেখান থেকে অর্থের বড় অংশ চলে যায় দেশটির ক্যাসিনোতে (জুয়ার আসরে)। আবার ক্যাসিনোতেও সেই অর্থ ছিল ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অর্থাৎ আরও ২০ দিন।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০০ কোটি ডলার সরাতে মোট ৩৫টি অনুরোধ পায় নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ। এর প্রথম চারটি অনুরোধে তারা ফিলিপিন্সের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের কয়েকটি অ্যাকাউন্টে ৮১ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তর করে। এরপর স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তরিত হয়ে ওই টাকার প্রায় অর্ধেক চলে যায় ক্যাসিনোর জুয়ার টেবিলে। পঞ্চম আদেশে শ্রীলঙ্কায় প্যান এশিয়া ব্যাংকিং করপোরেশনে একটি ‘ভুয়া’ এনজিওর অ্যাকাউন্টে ২০ মিলিয়ন ডলার পাঠানো হলেও বানান ভুলে সন্দেহ জাগায় শেষ মুহূর্তে তা আটকে যায়।

অর্থ চুরি যাওয়ার বিষয়টি প্রায় এক মাস চেপে রাখায় সমালোচনার মধ্যে পড়েন ড. আতিউর রহমান। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ঘটনার পর পরই বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে অবহিত করলে টাকার শতভাগ উদ্ধার করা সম্ভব হতো। ঘটনাটি ঘটনার পর পরই সরকারকে জানালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ফিলিপাইনের সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে টাকা উত্তোলন বন্ধ করা যেতো। কিন্তু অদৃশ্য কারণে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সরকারকে জানাতে চায়নি। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের। ঘটনার এক মাস ৯ দিন পর পদত্যাগ করেন ড. আতিউর রহমান। পরে সরকারের পক্ষ থেকে গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি।

ওই দিন বিকালে মতিঝিল থানায় একটি মামলা করা হয়। মামলার তথ্য অনুযায়ী- গত ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ই-মেইল পাঠিয়ে অর্থ স্থানান্তর বন্ধ করতে ফেডারেল ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ককে বলা হলেও সুইফট সিস্টেমের মাধ্যমে বেরিয়ে ফিলিপিন্স ও শ্রীলঙ্কার দুটি ব্যাংকে চলে যায় ১০ কোটি ডলার। শ্রীলঙ্কায় যাওয়া ২ কোটি ডলার আটকানো হলেও ফিলিপিন্সে যাওয়া অর্থ চারটি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তোলার পর অধিকাংশই চলে যায় ক্যাসিনোতে।

– বাংলা ট্রিবউন

বিস্তারিত দেখতে নিচের ছবিতে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.